নদীর স্রোতে জীবিকার খোঁজে!: নদী ঘিরে নানামুখী কর্মব্যস্ততা
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
৩০-০৯-২০২৬ ০২:০৯:৫৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
৩০-০৯-২০২৬ ০২:০৯:৫৪ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
কেউ ডিঙিতে জাল নিয়ে ছুটছেন নদীর মাঝ বরাবর, কেউ কূল ঘেঁষে জাল ফেলছেন মাছের আশায়। কেউ সাম্পানে ঘাট পার হয়ে যাচ্ছেন শহরের দিকে, কেউ দিনশেষে শহর থেকে ফিরছেন আপন গন্তব্যে। কোথাও ছোট ইঞ্জিনবোটে বরফ-লবণসহ জাহাজের রসদ, কোথাও জাহাজ থেকে নামানো হচ্ছে সাগর থেকে ধরে আনা মাছ। এরই ফাঁকে বালু বোঝাই বাল্কহেড ছুটে চলছে নদীর বুক চিরে।
এই দৃশ্য দেশের সবচেয়ে খরস্রোতা চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর। নদী ঘিরে নানামুখী কর্মব্যস্ততা বলছে, এটি কেবল একটি নদী নয়, নদীর মতোই চলমান কর্মযজ্ঞ— মানুষের জীবন-জীবিকার স্রোত; যেখানে ব্যস্ত জীবনের ঢেউ উঠছে বারবার।
কাপ্তাই বাঁধ থেকে বঙ্গোপসাগরের মোহনা পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর ৭৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে হাজারও মানুষের দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততা ভিন্ন এক দৃশ্যপট। দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর আর কর্ণফুলী নদী ঘিরে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী এক পরিকাঠামো; যা প্রতিনিয়তই সচল রাখছে সামষ্টিক অর্থনীতির চাকা।
বর্ষার শেষে, এই সময়টাতে কর্ণফুলীর স্বাভাবিক উচ্ছ্বলতা কিছুটা ধীর হয়ে আসে। এখন হালকা ঢেউ, নদীর বুকে নোঙর করা বড় বড় জাহাজের সারি, মাঝ বরাবর ছুটে চলা বাল্কহেড আর তীর ঘেঁষে ঐতিহ্যের সাম্পান— সব মিলিয়ে শরতের দুপুরে কর্ণফুলীর রূপ যেন ছবির ক্যানভাস। তবে প্রকৃতির রূপ যেমন হোক, নদীকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা নির্বাহকারী মানুষের প্রতিদিনের সংগ্রাম একই থাকে। নদীর বুকে প্রতিদিন চলে হাজারও মানুষের জীবিকার হিসাব। ঘাটে ঘাটে নৌযানের আসা-যাওয়া, মানুষের হাঁকডাক, পণ্য ওঠানামা আর ইঞ্জিনের শব্দে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সরগরম থাকে নদী ও নদীতীর।
শহরের ওপারে ব্রিজঘাটে গেলেই দেখা যায় নদীর বুকে ছোট ছোট ডিঙি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কোনোটি নদীর মাঝামাঝি, কোনোটি তীরের কাছাকাছি। একজন দাঁড় টানছেন, কয়েকজন গলুইয়ে দাঁড়িয়ে জাল ফেলছেন, আবার টেনে তুলছেন। জালে মাছ উঠলে মুখে হাসি, না উঠলে আবার নতুন জায়গার সন্ধান। আবার কেউ কূল থেকেই জাল ছুড়ে দেন। নদীর পানির গতিপ্রকৃতি, জোয়ার-ভাটা আর মাছের অবস্থান বুঝেই চলে তাদের প্রতিদিনের কর্মপরিকল্পনা।
ব্রিজঘাটের সাম্পান মাঝি আবুল বশর বলেন, ‘কর্ণফুলী নদীর ওপর অনেক মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে। অনেক মানুষ শুধু নদীতে মাঝ ধরে সেগুলো বিক্রি করেই সংসার চালান। তাই মাছ কম-বেশি পাওয়ার সাথে তাদের আনন্দেরও যোগসূত্র আছে। তাদের জন্য কর্ণফুলীই হলো কর্মক্ষেত্র।’
একটু দূরেই অন্য ব্যস্ততা। সাম্পান ঘাটে যাত্রী ওঠানামা করছেন। কেউ শহরের দিকে যাচ্ছেন, কেউ শহরের কাজ শেষে নদী পার হয়ে ফিরছেন। সাম্পান ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঝির বৈঠা পানিতে পড়ে একটি ছন্দ তৈরি হয়। নদীর ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় সাম্পান। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে থাকা এই সাম্পান এখনও কর্ণফুলী উপজেলার বহু মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের অংশ। যাদের কাছে নদী পার হওয়া প্রতিদিনের প্রয়োজন, তাদের কাছে সাম্পান কেবল ঐতিহ্যের প্রতীক নয়— এটি যাতায়াতের মাধ্যম, আয়ের উৎস।
একজন সাম্পান মাঝি বলেন, ‘এই নদী দিয়েই প্রতিদিন মানুষ পার করি। রোদ-বৃষ্টি, জোয়ার-ভাটা সব সময়ই আমাদের নদীতে থাকতে হয়। নদী শান্ত থাকলে যাত্রা কিছুটা আনন্দের হয়।’
কর্ণফুলীর কর্মব্যস্ততার আরেকটি বড় দৃশ্য দেখা যায় বড় জাহাজগুলোর আশপাশে। নদীতে নোঙর করা বিশাল জাহাজের পাশে দেখা যায় ছোট ছোট ইঞ্জিনবোট। কোনো বোটে বরফ, কোনো বোটে লবণ, আবার কোনো নৌযানে অন্যান্য প্রয়োজনীয় রসদ। ছোট বোটগুলো বড় জাহাজের কাছে গিয়ে সেই পণ্য পৌঁছে দেয়। জাহাজে থাকা কর্মীদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর জন্য এসব রসদ পৌঁছানোও নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবিকা।
জাহাজে বরফ নিয়ে যাওয়া হাবিবুর মিয়া বলেন, ‘জাহাজ নদীতে এলে আমাদের কাজ মিলে। বরফ, লবণসহ বিভিন্ন জিনিস পৌঁছে দিই। এগুলো সাপ্লাইয়াদের ব্যবসা, আমরা শুধু ভাড়া নিই। জাহাজ যতদিন থাকে, ততদিন আমাদেরও ব্যস্ততা থাকে।’
কর্ণফুলীর আরেকটি চিত্র ফিশারীঘাটে; এখানে আছে চট্টগ্রামের ‘ফিশপোর্ট’। মাছ ধরার নৌযান নদীতে এসে নোঙর করে। সেখান থেকে ছোট ইঞ্জিনবোটে করে মাছ আনা হয় ঘাটে। এরপর শুরু হয় আরেক দফা কর্মব্যস্ততা। মাছ নামছে, ঝুঁড়িতে উঠছে, বরফ দেওয়া হচ্ছে। কেউ মাছের দরদাম করছেন, কেউ মাছ নিয়ে ছুটছেন বাজারের দিকে। আড়তে চলছে বেচাকেনা। জাহাজ থেকে মাছ নামতেই আর কিছু মানুষের ব্যবসার পণ্য হয়ে যায়।
একজন মাছ ব্যবসায়ী বলেন, ‘নদী থেকে মাছ ঘাটে না এলে আমাদের ব্যবসা বন্ধ। জেলেরা মাছ নিয়ে আসে, আমরা কিনে বাজারে পাঠাই। এই ঘাটের সঙ্গে অনেক মানুষের রুটি-রুজি জড়িত।’
কর্ণফুলীর বুকের আরেক দৃশ্য বালু বোঝাই বাল্কহেড। ভারী শরীর নিয়ে ধীর অথচ নিরবচ্ছিন্ন গতিতে এগিয়ে চলে এসব নৌযান। বালুবোঝাই বাল্কহেডগুলো পানিতে এতটা তলিয়ে যায় যে দূরে থেকে দেখলে মনে হয় কোনো জাহাজ বোধহয় ডুবতে বসেছে। নৌপথে বালু পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত এসব বাল্কহেডও নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির অংশ। চালক ও শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা চলে নদীর স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে।
শরতের এই সময়টাতে কর্ণফুলীকে দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে শান্ত, স্নিগ্ধ একটি নদী। মেঘলা আকাশ, হালকা বৃষ্টি, নরম রোদ আর পানির ওপর ছোট ছোট ঢেউ- সব মিলিয়ে মন ভালো করে দেওয়ার মতো দৃশ্য। কিন্তু একটু কাছে গেলেই সেই দৃশ্যের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে অন্য এক গল্প।
ব্রিজঘাটে কর্ণফুলীর সৌন্দর্য দেখতে আসা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘কর্ণফুলী চট্টগ্রামের কাছে শুধু একটি নদীর নাম নয়। এটি একটি বিশাল কর্মক্ষেত্র। এর তীরে যেমন ইতিহাস গড়ে উঠেছে, তেমনি এর পানিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য পরিবারের বর্তমান। আমি বলি কর্ণফুলীর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য শুধু তার জল, ঢেউ কিংবা শরতের আকাশে নয়; এই নদী প্রতিদিন দুই পাড়ের হাজারও মানুষের জীবনও বয়ে নিয়ে চলছে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স